রোযার প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোন কিছু জানা যায় না।
ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দার্শনিক স্পেন্সার নিজের বই Principles of Sociology
-তে কতগুলো বন্য সম্প্রদায়ের উদাহরণ এবং জীব বৃত্তান্তের ওপর গবেষণা করে
লিখেছেন যে, রোযার প্রাথমিক মানদন্ড এভাবেই হয়তো হয়ে থাকবে যে আদিম বন্য
যুগের মানুষ স্বভাবতঃই ক্ষুৎ-পিপাসায় আক্রান্ত থাকতো এবং তারা মনে করতো
যে, আমাদের আহার্য বস্তু আমাদের পরিবর্তে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃতদের
নিকট পৌঁছে যায়। কিন্তু অনুমানসিদ্ধ উপাত্তকে যুক্তি ও বুদ্ধির আওতাভুক্ত
লোকেরা কখনো স্বীকার করে নেয় নি। (ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা: ১০ম খন্ড
১৯৪ পৃষ্ঠা একাদশ সংস্করণ)
মোট কথা অংশীবাদী ধর্মমতগুলোতে রোযার প্রারম্ভ এবং হাকীকতের যে কোন
কারণেই হোক না কেন ইসলামের দৃষ্টিতে এর প্রাথমিক পর্যায় ও শেষ পর্যায়কে
বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে নিজের অনুসারীদের ওকালতির প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ
করে না। ইসলামের মূল উৎস কুরআন করীমে উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করা হয়েছে,
| “ | হে
যারা ঈমান এনেছ তোমাদের ওপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের
পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে করে তোমরা তাক্ওয়া অবলম্বন করতে
পার”। (সূরা বাকারা: ১৮৪) |
” |
অপর এক আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন,
| “ |
রমযান
মাস হচ্ছে সেই মাস যার মাঝে কুরআন করীম নাযেল করা হয়েছে। যা মানুষের জন্য
পরিপূর্ণ হেদায়াত, পথ প্রদর্শনের দলিল এবং সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য
নির্ণয়কারী। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে এই মাসকে পাবে তাকে অবশ্যই রোযা রাখতে
হবে। আর যদি কেউ রুগ্ন হয় অথবা সফরে থাকে তাহলে সে সমপরিমাণ রোযা
অন্যান্য দিনসমূহে আদায় করবে। আল্লাহ্ পাক তোমাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ চান
এবং তোমাদের জন্য কাঠিন্য চান না এবং যেন তোমরা গণনা পূর্ণ কর এবং আল্লাহর
মহিমা কীর্তন কর এইজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হেদায়াত দিয়েছেন এবং যেন
তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর”। (সূরা বাকারা: ১৮৬) |
” |
হযরত আদম (আ.)-এর রোজা : হযরত আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল
খেয়েছিলেন এবং তারপর তাওবাহ করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তাওবাহ কবুল
হয়নি। ৩০ দিন পর তাঁর তাওবাহ কবুল হয়। তারপর তাঁর সন্তানদের উপরে ৩০টি
রোযা ফরয করে দেয়া হয়। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খণ্ড ১০২-১০৩ পৃষ্ঠা)।
হযরত নূহ (আ.)-এর রোজা : নূহ (আ.)-এর যুগেও সিয়াম ছিল। কারণ,
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন: হযরত নূহ (আ.) ১লা শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা
বছর রোযা রাখতেন (ইবনে মাজাহ ১২৪ পৃষ্ঠা)।
হযরত ইবরাহীম (আ.) ও বিভিন্ন জাতির রোজা : হযরত নূহ (আ.)-এর পরে
নামকরা নবী ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)। তাঁর যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ
কেউ লিখেছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর কিছু পরের যুগ বৈদিক যুগ।ইতিহাস
সাক্ষ্য দেয় যে, বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস
ছিল। প্রত্যেক হিন্দী মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের উপর একাদশীর’ উপবাস
রয়েছে।
হযরত দাউদ (আ.)-এর রোজা: হযরত মূসা (আ.)-এর পর কিতাবধারী বিখ্যাত
নবী ছিলেন হযরত দাউদ (আ.)। তাঁর যুগেও রোযার প্রচলন ছিল। আল্লাহর রাসুল
বলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোযা হযরত দাউদ
(আ.)-এর রোযা। তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোযায় থাকতেন (নাসাঈ
১ম খণ্ড ২৫০ পৃষ্ঠা, বুখারী, মুসলিম,মিশকাত ১৭৯ পৃষ্ঠা)। অর্থাৎ হযরত দাউদ
(আ.) অর্ধেক বছর রোযা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোযা থাকতেন।
ইহুদীদের মাঝেও রোযা ছিল আল্লাহ্র আরোপিত ফরজ ইবাদত। হযরত মূসা (আ.)
কুহে তুরে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ক্ষুৎ-পিপাসার ভিতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন।
(নির্গ: ৩৪-৩৮) সুতরাং সাধারণভাবে হযরত মূসা (আ.)-এর অনুসারীদের মাঝে
চল্লিশ রোযা রাখাকে উত্তম বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু তাদের ওপর চল্লিশতম
দিনে রোযা রাখা ফরজ বা তাদের সপ্তম মাসের (তাশরিন) দশম তারিখ পড়ত। (তৌরাত:
সফরুল আহবার: ১৬-২৯-৩৪: ২৩-২৭) এজন্য এই দশম দিনকে আশুরা বলা হতো। আর
আশুরার এই দিনটি ছিল ঐ দিন যেদিন হযরত মূসা (আ.)কে তৌরাতের ১০ আহকাম দান
করা হয়েছিল। এইজন্য তৌরাত কিতাবে এই দিনের রোযাকে পালন করার প্রতি জোর
তাগিদ করা হয়েছে। বস্তুতঃ উপরোল্লিখিত দিক-নির্দেশনা ছাড়া ইহুদীদের
অন্যান্য ছহীফাসমূহের মাঝে অন্যান্য দিনের রোযার হুকুম-আহকামও বিস্তৃতভাবে
পাওয়া যায়। (প্রথম শামুয়েল ৭-৬ এবং ইয়ারমিয়া ৩৬-৬) খৃষ্টান ধর্মে
বর্তমান কালেও রোযার প্রভাব বিদ্যমান। হযরত ঈসা (আ.)ও চল্লিশ দিন পর্যন্ত
জঙ্গলে অবস্থান করে রোযা রেখেছেন। (মথি: ৪-২)
হযরত ইয়াহইয়া (আ.) যিনি হযরত ঈসা (আ.)-এর সমসাময়িক ছিলেন তিনিও রোযা
রাখতেন এবং তার উম্মতগণের মাঝেও রোযা রাখার রীতির প্রচলন ছিল। (মার্কস:
২-১৮)
ইহুদীরা বিভিন্নকালে অসংখ্য ঘটনাবলীর স্মৃতিস্বরূপও এর সাথে অনেকগুলো
রোযা সংযোজন করেছিল। এর অধিকাংশই ছিল বেদনাময় স্মৃতির স্মরণিকা। এই সকল
রোযার মাধ্যমে তারা নিজেদের অতীত বেদনাময় স্মৃতিগুলোকে উজ্জীবিত করে
তুলতো। এমন কি দেহ-মনের মাঝেও বেদনা ছাপ ফুটিয়ে তুলতো। (কোযাত: ২০-২৬,
প্রথম শামুয়েল: ৭-৬ ও ৩১-১৩ এবং লুক: ৬-১৬) হযরত ঈসা (আ.) স্বীয় আমলে
কিছু সংখ্যক রোযা রাখার অনুমতি বা অবকাশও ছিল। একবার কতিপয় ইহুদী সমবেত
হয়ে হযরত ঈসা (আ.)-এর নিকট এই আপত্তি উত্থাপন করলো যে, তোমার অনুসারীরা
কেন রোযা রাখছে না। হযরত ঈসা (আ.)-এর জবাবে বলেন,
| “ |
তবে
কি বরযাত্রীগণ যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান করে তারা ততক্ষণ পর্যন্ত
রোযা রাখতে পারে না। সুতরাং এমন এক সময় আসবে যখন দুলা তাদের সাথে থাকবে
না তখন তারা রোযা রাখবে।” (মার্কস: ২-১৮) |
” |
এই দিক নির্দেশনায় দুলা বলতে নির্দেশ করা হয়েছে হযরত ঈসা (আ.)-এর
পবিত্র সত্তাকে এবং বরযাত্রী বলা হয়েছে তার অনুসারী হাওয়ারীদেরকে। একথা
সুস্পষ্ট যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন স্বীয় উম্মতের মাঝে অবস্থান করেন ততক্ষণ
উম্মতদের শোক পালনের কোন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় না। সুতরাং উপরোল্লিখিত
বর্ণনার দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ.) হযরত মূসা (আ.) এর আমলে
প্রবর্তিত ফরজ এবং মোস্তাহাব রোযাসমূহকে নয়; বরং শোক পালনার্থে প্রচলিত
নব্য রোযার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং তিনি স্বীয় অনুসারীদেরকে
পূর্ণ আন্তরিকতা ও বিশুদ্ধচিত্ততার সাথে রোযা রাখার উপদেশ প্রদান করতেন।
যেমন,
| “ |
অতঃপর
তোমরা যখন রোযা রাখবে তখন লোক দেখানো মনোবৃত্তি সম্পন্ন মানুষের মত
নিজেদের মুখমন্ডলকে উদাস করে রাখবে না। কেননা, এই শ্রেণীর লোক নিজেদের
মুখমন্ডলের আসল রূপ বিকৃত করে ফেলে যেন মানুষ মনে করে যে তারা রোযাদার। আমি
তোমাদের কাছে সত্য কথাই বলছি। এ শ্রেণীর লোকেরা তাদের বিনিময় পেয়ে গেছে।
সুতরাং তোমরা যখন রোযা রাখবে তখন মাথায় তেল ব্যবহার করবে, মুখমন্ডল ধৌত
করবে। এতে করে তোমরা মানুষের নিকট নয়; বরং তোমাদের পিতার নিকট গোপনীয়
ভাবে অবস্থান করবে। তোমরা যারা রোযাদার তা সুস্পষ্ট এবং তোমাদের পিতার নিকট
যা প্রচ্ছন্ন ও গোপনীয় তিনি তার সরাসরি প্রতিফল ও বিনিময় অবশ্যই প্রদান
করবেন’। (মথি: ৬- ৬-৭) |
” |
অপর এক স্থানে হযরত ঈসা (আ.)-এর নিকট তার অনুসারীরা জিজ্ঞেস করলো যে
আমরা আমাদের অপবিত্র অন্তর সমূহকে কিভাবে দূর করে দিতে সক্ষম হবো?
প্রত্যুত্তরে হযরত ঈসা (আ.) বললেন,
| “ |
অন্তর সমূহের কলুষতা ও অপবিত্রতাকে দোয়া এবং রোযা ছাড়া দূর করার কোন ব্যবস্থা নেই”। (মথি: ১৭-২১) |
” |
আরববাসীরাও ইসলামের পূর্বে রোযা সম্পর্কে কমবেশী ওয়াকিফহাল ছিল। মক্কার
কুরাইশগণ অন্ধকার যুগে আশুরার (অর্থাৎ ১০ মুহররম) দিনে এ জন্য রোযা রাখতো
যে, এই দিনে খানা কাবার ওপর নতুন গেলাফ চড়ানো হতো। (মুসনাদে ইবনে হাম্বল:
৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ২৪৪) মদীনায় বসবাসকারী ইহুদীরাও পৃথকভাবে আশুরা উৎসব পালন
করতো। (সহীহ বুখারী: কিতাবুস সওম, ১ম খন্ড, পৃ: ১৬২) অর্থাৎ ইহুদীরা
নিজেদের গণনানুসারে সপ্তম মাসের ১০ম দিনে রোযা রাখতো।